ক্লাসরুমটা এখনও আমায় ডাকে!

এসেম্বলিতে সামনে দাঁড়ানো বন্ধুর অমনোযোগীতার সুযোগ নিয়ে মাথায় সজোরে চাটি মারতাম, জাতীয় সংগীতের সময় শুধু ঠোট নাড়িয়ে যেতাম। এটেনডেন্স এর সময় অনুপস্থিত বন্ধুর প্রক্সি দিতাম,পেছনে বসলে বন্ধুর হাত মুখ চেপে ধরে রাখতাম যাতে এটেনডেন্স না দিতে পারে,হোমওয়ার্ক না করার হাজারটা অজুহাত দেখাতাম,অদ্ভুত সব আলোচনা শুরু করে ক্লাসের সময় নষ্ট করতাম,বইয়ের আড়ালে রগরগে সব উপন্যাস পড়তাম।

বাথরুমে যাবার নাম করে বাইরে সময় কাটিয়ে আসতাম, স্যার ম্যাডামদের, হপিং বি.এস.সি,ধরিস,চন(জীন এর আঞ্চলিক সংস্করণ) ইত্যাদি অদ্ভুত সব নাম দিতাম,ক্লাসে লুকিয়ে,লুকিয়ে অদ্ভুত সব শব্দ করে ক্লাসের সময় নষ্ট করতাম,টাকা বাধার এলাস্টিক ব্যান্ড আর কাগজের ছোট ছোট গুলতি বানিয়ে বন্ধুর মাথায় মারতাম,ফাকা সময়ে বেঞ্চিতে কলম টুর্নামেন্ট কিংবা বইকে ব্যাট আর কাগজ কে গোল করে পাকিয়ে বল বানিয়ে ক্রিকেট খেলা তো আছেই।

এই কুকর্মের সাক্ষী আছে ক্লাসরুমে সেই দরজা জানালা আর বেঞ্চিতে আমাদের লেখা নামগুলো। টিফিন টাইমে আলম ভাই,হক ভাই,শাবুল ভাইয়ের চানাচুর আচার পাপড় খেয়েই নেমে পড়তাম গোল্লাছুট কিংবা ভলিবল খেলতে।মাঝে মাঝে খেলা বাদ দিয়ে শহীদ মিনারের নিচে বন্ধু বান্ধবি মিলে তুমুল আড্ডা হতো। কারো সাথে ঝগড়া লাগলেই চিরপরিচত সেউ ওয়ার্নিং,”আজ স্কুল ছুটি দিলে দেখা করিস তোর খবর আছে।

“তারপর লাগত দুই দলের যুদ্ধ যার কাছে গ্যাংস্টারদের গ্যাং ওয়্যার কিছুই না। বয়স তখন বেশী ছিলো না পনেরো কি ষোল,ঠোটের একটু উপরে উকি দিতে শুরু করেছে গোফেরা, স্কুল ভবনের পিলারের আড়ালে দাঁড়িয়ে জীবনের প্রথম যার প্রেমে পড়েছিলাম, তার হাসি দেখতাম,দেখতাম তার গালে নেমে আসা অবাধ্য চুল গুলোকে অনামিকা আর মধ্যমার মাঝে বন্দি করে কানের পথে পেছনে ফিরিয়ে দেওয়া,হালকা ব্যাথা হতো বুকে সেই সাথে প্রথম প্রেমের অনুভুতি।

সেই প্রেমে সাক্ষী এখনও আছে ক্লাসের সেই লাস্ট বেঞ্চে লেখা আমাদের নামে অদ্যাক্ষর গুলো! মেয়েদেরও ছিলো ক্রাশ,কোন মেয়ে যদি বলে সে স্কুল জীবনে কোন স্যারের কিংবা বড় ভাইয়ের প্রেমে পড়েনি তাহলে নিশ্চিত সে মিথ্যা বলছে,স্কুলে সদ্য জয়েন করেছে,ক্লিন শেভড,চশমা পড়ে এমন প্রতিটি শিক্ষকের প্রেমেই বান্ধবিগন হাবুডুবু খেতেন।

মায়ের নতুন কেনা ফোন স্কুলে নিয়ে এসে বন্ধুদের সামনে ভাব নেওয়া,এফ এম রেডিও,এমপি থ্রি, এমপি ফোর নামক গান শোনার ছোট ছোট যন্ত্রগুলোর সময় পেরিয়ে হাতে ফোনও এলো স্কুলে থাকতে ,৫১২ মেগাবাইটের মেমোরি আর স্যামফোনি কিংবা মাইক্রোম্যাক্সের অডিও অথবা ভিডিও ফোন,মনে হতো জগতের অষ্টম আশ্চর্য আমার হাতে।

আমিবকত ভাগ্যবান,সিম কেনাটা তখনো হয়ে ওঠেনি,যে বন্ধুর ফোনে তপু,আরফিন রুমি,বালাম,বাপ্পা,হৃদয় খান,ন্যান্সি পড়শী দের দেশী গান,আতিফ আসলাম,আদনান ,সনু নিগামের হিন্দি গান, টাইটানিকের গান,থাকত তার মূল্য ছিলো আকাশ ছোয়া একটা একটা করে গান শেয়ার হতো ব্লুটুথে ব্লুটুথের সেই চাহিদাটা আজকের শেয়ার ইট পোলাপাইন বুঝতেই পারবেনা।

আস্তে আস্তে গোফ গজালো ঠোটের উপর,মনে মনে নিষিদ্ধ আনন্দ হয়েছি তো বড়,আর তাই প্রমান করতেই তরুনীর ঠোটের স্পর্শ না পাওয়া সেই গোলাপি রঙের ঠোট গুলোতে লাগত নিকোটিনের ছোয়া,ফুসফুসে প্রবেশ হতো নিকোটিনের ,হাতে নানা রঙের রিচ ব্যান্ড,পায়ে শীত কালে পান্ডার শু আর গরমে ক্যাঙারু কোম্পানির বেলওয়ালা স্যান্ডেল ক্লাসের।

বাইরে স্কুল ড্রেসের কলার উঠিয়ে ঘুরে বেরানো,আহারে সেই দিনগুলো!হুট করে এস.এস.সি, বিদায়, স্কুল ছাড়া সবাই এক থাকব বলে কথা দেওয়া,প্রতি বছর পূর্বমিলনীর প্রতিজ্ঞা,শেষবারের মতো স্যারদের পা ছুয়ে ক্ষমা চেয়ে,জুনিয়রদের দেওয়া রজনীগন্ধ্যা হাতে বন্ধুদের জরিয়ে ধরে কাদতে কাদতে বাড়ি ফেরা,আর কোনদিন যাওয়া হয়নি সেখানে ছাত্র হয়ে।

ভবনের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় ক্লাসরুমটা এখনও আমায় ডাকে, বলে তোরা ভালো আছিস তো?এতো জলদি আমায় ভুলে গেলি! হাসতে আসতে আমি বলি ভুলি কি করে?শুধু জীবনের তাগীদে অতীতকে আর মনে পড়েনা!

Reply