৫ থেকে চার হাজার কর্মী

শীতের বিকেল। কারওয়ান বাজার থেকে গন্তব্য খিলক্ষেত। বিমানবন্দর সড়কের পাশেই একটি সুউচ্চ ভবনে জেনেক্স ইনফোসিস লিমিটেডের অফিস খুঁজে পেতে কষ্ট করতে হয়নি। আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে অফিসে প্রবেশ করতেই কর্মব্যস্ততায় চোখ আটকে যায়।

সবাই ব্যস্ত যাঁর যাঁর মতো করে। প্রতিষ্ঠানটির সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা প্রিন্স মজুমদারের সঙ্গে রুমেই কথা হয়। শোনা হয় শুরু থেকে আজকের অবস্থানে আসার গল্প। চলুন শুনি জেনেক্স ইনফোসিস লিমিটেডের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা প্রিন্স মজুমদার মুখেই।

শুরুর কথা

আমরা শুরু করি ২০১২ সালে। তখন দেশের বিপিও এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতের অবস্থা তেমন ভালো ছিল না। আমাদের দেশের তুলনায় ভারত ও ফিলিপাইনে এই সেক্টরটা অনেক এগিয়ে। দেশেকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য আইটি সেক্টর হতে পারে বড় একটি হাতিয়ার। সেই চিন্তা থেকেই প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলা।

এই সেক্টরে আসার কারণ

আমাদের দেশে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো কাজের সমস্যা। আবার দেশেই অনেক কাজ রয়েছে। তবে রয়েছে দক্ষতার অভাব। কিন্তু আবার দেশেই যদি কারও কম্পিউটারে দক্ষতা থাকে, তাহলে তাঁকে এক মাসের প্রশিক্ষণ দিয়ে কাজে লাগানো যায়। আমাদের এখানে খুবই দ্রুত প্রযুক্তির ক্ষেত্রে জনবল তৈরি করার সুযোগ রয়েছে। সে কারণে আমরা এই সেক্টরে কাজ শুরু করেছি।

লক্ষ্য আকাশছোঁয়া

আমাদের কোম্পানি শুরু হয়েছিল দুজন দিয়ে। তখন বনানীতে ছোট্ট একটি অফিস ছিল আমাদের। এখন আমাদের কর্মীর সংখ্যা চার হাজারের বেশি। প্রতিষ্ঠার পর আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় কাজ হলো রবি আজিয়াটার সঙ্গে। রবির কাজটা পাওয়ার পরই আমাদের কর্মীর সংখ্যা তর তর করে বাড়তে থাকে। তখন ২ জন থেকে ৭০০ কর্মী হয়ে গেল। আমাদের এগিয়ে যাওয়া তখন থেকেই শুরু।

শিক্ষার্থীর হাতে হাত রেখে

বাংলাদেশে শিক্ষার্থীদের জন্য কোনো চাকরির সুযোগ ছিল না আগে। আমরা এ ক্ষেত্রে একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছি। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের কোনো অভিজ্ঞতা ছাড়াই কাজের সুযোগ করে দিয়েছিলাম তখন। এই সিদ্ধান্তটা আমাদের জন্য খুবই কাজে দিয়েছিল। বর্তমানে আমাদের কোম্পানির চার হাজার কর্মীর মধ্যে অনেকেই পড়াশোনা করার পাশাপাশি আমাদের এখানে কাজ করছেন। এর ফলে শিক্ষার্থীরা চাকরি সম্পর্কে একটা ভালো ধারণা নিয়ে শিক্ষাজীবন শেষ করতে পেরেছেন। শুধু আমরা চাকরি দিয়েই বসে থাকি না। শিক্ষার্থীদের দক্ষ করে গড়ে তোলার জন্য বিভিন্ন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছি। শিক্ষার্থীরা এখানে কাজ করতে করতে অনেক ভালো চাকরির জন্য তৈরি করতে পেয়েছেন। এখানে আমাদের একটা সুবিধা আছে।

আমরা যখন শিক্ষার্থীদের চাকরিতে নিচ্ছি, তখন কম হলে তাঁকে তিন বছরের জন্য আমরা খুব ভালোভাবে পাই। এবং পাস করার পর উচ্চতর পদে যোগ্যতা অনুযায়ী আমাদের প্রতিষ্ঠানেই কাজ করার সুযোগ রয়েছে। এই নিয়োগগুলো করার ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে কাজ করার আরও আগ্রহ তৈরি হয়েছে। জেনেক্স প্রথম বছরে ১৫২ জন শিক্ষার্থীকে স্থায়ী কর্মী হিসেবে রেখে দেয়।

কর্মীকে দক্ষ করা

আমাদের প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা শুরুর চাকরিই করেন। কর্মীদের দক্ষ করে গড়ে তোলার জন্য বিভিন্ন বিষয়ে তাঁদের প্রশিক্ষণ করানো হয়। ভবিষ্যতে যেন তাঁরা কোথায় আটকে না যান, সে জন্যই এই প্রশিক্ষণ। শিক্ষার্থীদের এই প্রশিক্ষণের পর আরও বেশি ভালোভাবে কাজ করতে পারে। এটা তাঁর সারা জীবনের একটা অর্জন।

বর্তমানে কী করছি

জেনেক্স ইনফোসিস লিমিটেড যুক্তরাজ্যভিত্তিক বড় ব্যবসায়িক গ্রুপ ইপিইর (আইপিই) একটি প্রতিষ্ঠান। এটি ২০১২ সালের মে মাসে বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করে। কোম্পানিটির মূল ব্যবসা হচ্ছে বিপিও (বিজনেস প্রসেসেস আউটসোর্সিং)। এ ছাড়া ডেটা এন্ট্রি, ডেটা প্রসেসিং, আইটি সাপোর্ট, সফটওয়্যার মেইনটেন্যান্স, কন্টাক্ট সেন্টার, সিস্টেমস ইন্টিগ্রশন এবং েমইটেনেন্স, ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশন, রোবটিক প্রসেস অটোমেশন, ক্লাউড মাইগ্রেশন, সাইবার সিকিউরিটি সলিউশন, সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, ডিজিটাল কন্টেন্ট ম্যানেজমেন্ট ইত্যাদি সেবা দিয়ে থাকে কোম্পানিটি। প্রতিষ্ঠানটির ছয়টি বিজনেস ইউনিট রয়েছে। এর মধ্যে জেনেক্স একাডেমিতে আমরা দক্ষ জনবল তৈরিতে কাজ করছি।

৩০ হাজার মানুষকে চাকরি

জেনেক্স ইনফোসিস লিমিটেড এখন পর্যন্ত প্রায় ৩০ হাজার মানুষকে চাকরি দিয়েছে। এখানে ৩০ হাজার একটি নির্দিষ্ট সংখ্যা। কিন্তু এই ৩০ হাজার মানুষের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে আরও কয়েক লাখ মানুষ। এ সুযোগ যদি শিক্ষার্থী না পেতেন, তাহলে খারাপ পথে চলে যেতে পারতেন। জেনেক্স একাডেমির মাধ্যমে এই প্রশিক্ষণ এখন উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত করানো হচ্ছে। সেখানে আমরা ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি। নারীর ক্ষমতায়নে আমার কাজ করছি। আমাদের প্রতিষ্ঠানে ৪৮ শতাংশ নারী কাজ করেন।

কোম্পানির গ্রাহক

জেনেক্স ইনফোসিস মূলত বড় বড় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করে। ২৫টির বেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে আমাদের। এর মধ্যে রয়েছে স্থানীয় ও বিদেশি খ্যাতনামা কিছু প্রতিষ্ঠান। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে গ্রামীণফোন, রবি আজিয়াটা, স্যামসাং লিমিটেড, ডিজি কমিউনিকেশন বেরহাড (মালয়েশিয়া), ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ, গ্রিন ডেল্টা ইনস্যুরেন্স, জিডি অ্যাসিস্ট প্রমুখ। আমরা আস্তে আস্তে আমাদের ডেলিভারি সাইটকে দেশের বাইরে নিয়ে গিয়েছি। বর্তমানে আমাদের মালয়েশিয়া, ভারত ও মিয়ানমারে ডেলিভারি সেন্টার রয়েছে।

সহযোগী

গ্রিড অ্যান্ড রেড টেকনোলজিস লিমিটেড নামে জেনেক্সের একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান আছে। গ্রিন অ্যান্ড রেড (জিএনআর) একটি স্বতন্ত্র কোম্পানি হিসেবে ২০০৯ সালে নিবন্ধিত হয়ে ব্যবসা শুরু করে। জেনেক্স ইনফোসিস ২০১৫ সালে গ্রিন অ্যান্ড রেডকে অধিগ্রহণ করে। গ্রিন অ্যান্ড রেডের মূল ব্যবসা হচ্ছে স্থানীয় ওয়েবসাইটগুলোতে বিজ্ঞাপন সরবরাহ করা, যা গুগল অ্যাডসেন্সের মতো করে ওয়েবসাইটে প্রদর্শিত হয়। এ ছাড়া কোম্পানিটি নেটওয়ার্ক সলিউশনস, সফটওয়্যার সলিউশনস, গ্রাফিক ডিজাইনসহ নানা ধরনের সেবা দিয়ে থাকে।

যাঁদের হাত ধরে

জেনেক্স ইনফোসিসের চেয়ারম্যানের দায়িত্বে আছেন চৌধুরী ফজলে ইমাম। তিনি যুক্তরাজ্যভিত্তিক আইপিই গ্রুপের চেয়ারম্যান। অনিবাসী এই বাংলাদেশি প্রায় ৪০ বছর নোভার্টিস, ক্যাম্পসহ বিভিন্ন বহুজাতিক কোম্পানিতে উচ্চতর পদে কাজ করেছেন। জেনেক্স ইনফোসিসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক চৌধুরী আদনান ইমাম যুক্তরাজ্যের চার্টার্ড সার্টিফায়েড অ্যাকাউনট্যান্ট। তিনি লন্ডনে বিনিয়োগ ব্যাংক মেরিল লিঞ্চে দায়িত্বশীল পদে কাজ করেছেন। তিনি ২০০৯ সালে বাংলাদেশে ফাইন্যান্স, ট্রেডিং, তথ্যপ্রযুক্তি, রিয়েল এস্টেটসহ বিভিন্ন খাতে ব্যবসা শুরু করেন।

Reply